নিশির সঙ্গে পরিচয় অনলাইনে। আমার একাকী জীবনে আলো জ্বালিয়েছে সে। চরম দুঃসময়ে বন্ধু হয়ে পাশে থেকেছে। প্রেমিকা না হলেও সে অনেক কিছু। আমার প্রেমিকা পুষ্পিতার যেদিন বিয়ে হয়ে যায় সেদিন মনে হয়েছিল কোথাও কোনো আলোর চিহ্ন নেই। ভাবলাম সে নিজের জীবন বেছে নিয়েছে। নিজের মতো বাঁচার অধিকার সবারই আছে। আমি আসলে তাকে কি দিতে পারতাম—মিষ্টি কথার কিছু সুন্দর মুহূর্ত। এগুলো দিয়ে অলস সময় কাটে, জীবন চলে না।
সেদিনই নিশির সঙ্গে আমার প্রথম কথা হয়। তখন ৯০-এর দশক-বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে। ইন্টারনেট মোবাইল খুব বেশি ছিল না। আমি উত্তরার রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্সের উলটোদিকে একটি ইন্টারনেট ক্যাফেতে ঢুকলাম। দুই ঘণ্টা ইন্টারনেট ব্যবহার করলে ত্রিশ টাকা দিতে হবে। পকেটে তখন একশ টাকার মতো আছে। কর্নারের দিকে একটি কম্পিউটারে বসলাম। আমাকে ছোট্ট কাগজে পাসওয়ার্ড দেওয়া হয়েছে। কম্পিউটার খুলতেই দেখি একটি অনলাইন আড্ডাখানা খোলা। সবার কেমন যেন অদ্ভুত নাম। শুধু একটি আইডিতে দেখলাম ‘রক্তকরবী’ লেখা। আমার খুব প্রিয় একটি নাটক। বেশ আগ্রহী হয়ে ভাবলাম একটু নক করি?
শুধু বললাম, ‘হাই’।
সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর এলো ‘হাই’।
লিখলাম, আমার মনে জমানো কিছু কথা আছে যেগুলো আমি আসলে পরিচিত কাউকে বলতে পারছি না। যেহেতু আমরা কেউ কাউকে চিনি না তাই আপনাকে বলাটাই সহজ মনে হচ্ছে। অনেক স্বপ্ন ঝরে পড়ার কষ্ট নিয়ে বসে আছি। এই অপরিচিত ইন্টারনেট ক্যাফেতে। আমার প্রিয়তম মানুষটির আজ শুভ বিয়ে বার্ষিকী । হয়ে গেছে। হৃদয় হয়েছে ক্ষত-বিক্ষত। আজ আমার স্বপ্নের মৃত্যু হয়েছে। আপনি পুরুষ, নারী, বয়স্ক, অপ্রাপ্তবয়স্ক এতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার প্রয়োজন শুধু এমন একজন, যে বন্ধুর মতো আমার কষ্টের কথাগুলো চুপচাপ শুনবে।
—আপনাকে আমি সেই সুযোগ কেন দেব? মেয়ে পটানোর আধুনিক পদ্ধতি এটা।
—আপনি মেয়ে, এটা তা হলে নিশ্চিত হওয়া গেল। এখন বলুন একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ে রাতারাতি যাকে ভুলে গেছে তার গোপন কথাগুলো আর সেই নক্ষত্রের পতনের শব্দ শুনবেন কি না?
—আপনি তা হলে নিজেকে নক্ষত্র ভাবেন? দেখুন আপনি মানুষ হিসেবে কেমন তার চাইতে বেশিরভাগ মেয়েরা ছেলেদের সামাজিক অবস্থান, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে বেশি পছন্দ করে। আমার অন্তত তাই ধারণা। কেউ কেউ অবশ্য তার সঙ্গে কাটানো আনন্দপূর্ণ মুহূর্তগুলো সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বেশি প্রাধান্য দেয়। সেটা আসলে খুবই হাতে-গোনা।
—সেই ক্ষেত্রে বলব, নিজেকে প্রমাণ করার কোনো যোগ্যতা আমার আসলে নেই। বলতে গেলে আমি এই ছোট্ট ক্যাফের ইন্টারনেট বিল পরিশোধ করার ক্ষমতাও রাখি না। আমি চাঁদের আলো দূর থেকে দেখে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে দিতে পারি, কিন্তু সেই চাঁদের কাছে যাওয়ার দুঃসাহস কোনোদিন করিনি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস বিধাতা আমাকে পূর্ণিমার আলো উপহার দিয়েছিলেন। তাকে ছোঁয়ার সৌভাগ্যও প্রদান করেছিলেন কিন্তু আমার তখন চন্দ্রগ্রহণের কথা একেবারেই মনে ছিল না।
—আপনার বুঝি এখন চন্দ্রগ্রহণ চলছে? সেটা তো সাময়িক।
—কিছু গ্রহণ একবার লাগলে তার দাগ আজীবন সরানো যায় না। অভিশপ্ত দিন কাটানো ছাড়া তখন আর কোনো উপায় থাকে না।
—মিথ্যে কথা, আমি বিশ্বাস করি না।
এভাবেই নিশি ও আমি একে অন্যকে খুঁজে পেলাম। সম্পূর্ণ অপরিচিত দুজন মানুষ দুই ঘণ্টা একটানা অনলাইনে কথা বললাম। সেদিনই সে আমাকে শিখিয়েছে, কীভাবে ইয়াহু মেসেনজারে একটি নির্দিষ্ট সময়ে তাকে সহজেই খুঁজে পাওয়া যাবে। সেদিন থেকে বন্ধু হয়ে সে সবসময় আমার পাশে থেকেছে। সে ছিল আমার খোলা আকাশ। যেখানে আমি চিঠির কবুতর যখন খুশি পাঠিয়ে দিতাম। সেও সময় পেলে কিছু না কিছু লিখে পাঠিয়ে দিত।
সেদিনের পর রোদ, বৃষ্টি, ঝড় উপেক্ষা করে আমি বার বার ক্যাফেতে ছুটে গিয়েছি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা গল্প করেছি। ভেতরে ভেতরে সে ছিল আমার মতোই সম্পূর্ণ একা একজন মানুষ। আমি সেটা খুব অনুভব করতাম।
যদিও কখনো তা বুঝতে দিতাম না। কিছুদিন কথা না হলেও আমরা একে অন্যকে দোষারোপ করতাম না, বা প্রশ্ন করতাম না। মাঝেমধ্যে দুজন দুজনকে ইমেইল করতাম। ইচ্ছে হলে নির্দিষ্ট দিনে আবার দুজনের মেসেনজারে কথা হতো। সে আমাকে তার কণ্ঠে গাওয়া গানের দু-একটি লাইন হঠাৎ হঠাৎ পাঠিয়ে দিত। যেগুলো শুনতে বার বার ক্যাফেতে গিয়ে অযথাই বসে থাকতাম। তার পরিবার নিয়ে আমি কখনো কিছু জানতে চাইনি। আমার কল্পনার জগতেই তাকে সবসময় রেখে দিতে চেয়েছি। তার সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো আমার কাছে অন্যরকম।
আমরা কেউ কাউকে দেখিনি।
আজই প্রথম জানতে পারলাম, সে এ দেশে থাকে না। কয়েকদিন হলো আমেরিকা থেকে ঢাকায় এসেছে। সে বিবাহিত। তার দুটি কন্যাসন্তান আছে। স্বামী ব্যবসায়ী।
‘রক্তকরবী’ একটি বিষাক্ত ফুল এটা আমার আগে জানা ছিল না।
Leave a Reply