প্রকাশিত লেখা

প্রবন্ধ

অনশন শিল্পী: যাপিত জীবনের অস্তিত্ববাদী চেতনার স্ফুরণ

ফ্রানৎস কাফকার ‘অনশন শিল্পী’ গল্পটি নিয়ে আলোচনার সময় তিনি নিজেই বলেছিলেন, এটি তাঁর মৃত্যুর পরেও টিকে থাকবে। গল্পটি তিনি লিখেছিলেন জীবনের শেষ সময়ে, যখন তিনি দুঃখ, ক্লান্তি ও বিষণ্ণতায় জর্জরিত এবং মরণব্যাধিতে আক্রান্ত। এই সময় কাফকা প্রায় সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ, চরম নির্জনতার মাঝে কাটিয়েছিলেন তাঁর জীবনের শেষ সাতটি বছর। গভীর অন্ধকার আর একাকিত্বে আচ্ছন্ন এই সময়ে তিনি সবসময়ই ভাবতেন, তাঁর অনেক কাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। তবুও, এই গল্পে তিনি জীবনের গভীর সত্যকে তুলে ধরেছিলেন, যা আজও পাঠকদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে।

  • ১৯১৭ সালের নভেম্বরের ডায়েরিতে তাই খুব স্পষ্ট করেই লিখেছেন কাফকা,

‘I haven’t yet written down the decisive thing… the work awaiting me is enormous.’

‘A Hunger Artist’ সম্পর্কে বিশদ আলোচনার আগে তাঁর সম্পর্কে কিছু ধারণা দিয়ে রাখা উচিত বলে মনে করছি। ১৮৮৩ সালের ৩ জুলাই প্রাগে এক সচ্ছল মধ্যবিত্ত ইহুদি বাবসায়ী পরিবারে ফ্রানৎস কাফকা জন্মগ্রহণ করেন। ১৯০১ সালে কাফকা জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন নিয়ে পড়াশুনা শুরু করেন। ঠিক পছন্দ না হওয়ায় দুই সপ্তাহ পড়ে আবার ভর্তি হন আইন বিভাগে। যেখানে দেখা পেয়ে যান চিরদিনের বন্ধু ম্যাক্স ব্রড’কে। তাদের দুজনের বন্ধুত্ব আজীবন অক্ষুণ্ণ ছিল এবং চরম সত্যি হলো ব্রড-এর উদারতা না থাকলে আমরা কেউই হয়তো বিশ্ব সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র কাফকার লেখা সম্পর্কে কোনোদিন জানতেই পারতাম না। ব্রড-এর উৎসাহেই জার্মান ও ফরাসি ভাষা শিখেছিলেন কাফকা। ফলে দুর্দান্ত পড়ুয়া কাফকা দস্তয়েভস্কি ও মহকবি গ্যয়টে-সহ বিখ্যাত লেখকদের লেখা পড়তে শুরু করেন এবং সেই অনুপ্রেরণায় সাহিত্যে উজ্জ্বলতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। 

১৯০৬ সালে ফানৎস আইন নিয়ে ডক্টরেট করেন ‘Juris Prudence’-এ। এরপর তিনি রিচার্ড লোয়ির ‘ল’অফিসারের অধীনে কেরানি হিসেবে যোগদান করেন এবং পছন্দ না হওয়ায় দেড় বছরেই বেশ কয়েকটি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা দেন। তাঁর লেখা ডায়েরি থেকে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট, চাকরিতে কোনো সময়ই কাফকা খুব বেশি খুশি ছিলেন না। কারণ একটাই, কাজের সময়গুলো ছিল খুব দীর্ঘ, যা তাঁর লেখালেখির প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আইনে দক্ষ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনি Worker’s Accident Insurance কোম্পানিতে তাঁর পছন্দের কাজটা ঠিকই পেয়ে যান। এখানে তাঁর কাজের পরিধি ছিল খুব অল্প, ফলে অফিসে বসে অবসর সময়ে লেখালেখি করতে পারতেন তিনি। কর্মক্ষম থাকাকালীন এই চাকরিতেই তিনি দীর্ঘদিন ছিলেন। 

১৯২৩ সালে মৃত্যুর প্রায় বছরখানেক আগে প্রতিভাময়ী এক ইহুদি অভিনেত্রী ডোরা ডাইম্যানট-এর সাথে পরিচয় ও পরিণয় ঘটলে বার্লিনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন কাফকা। হিব্রু ভাষা ও সাহিত্যে ডোরার বিশদ জানাশুনা কাফকা’কে খুব মুগ্ধ করে।  তাঁর সাথে কাটানো সময়টা কাকফার বেশ শান্তিতেই কাটে। দীর্ঘদিনের মানসিক অস্থিরতা ও বিষণ্ণতা তিনি তখন প্রায় কাটিয়ে ওঠেন। কিন্তু জীবন খুবই বিচিত্র। দুরারোগ্য যক্ষা ততদিনে তাঁর শরীরে জেঁকে বসেছে। কাফকার স্বাস্থ্য ক্রমাগত খারাপ হতে থাকে, তাঁর জীবনীশক্তি যা মোটামুটি নিঃশেষ করে দেয়। অসহনীয় যন্ত্রণাভোগ করে মাত্র ৪০ বছর ১১ মাস বয়সে ১৯২৪ সালের ৩ জুন কাফকা মৃত্যুবরণ করেন। 

ধারণা করা হয় শেষ দিকের এই ক্ষুধার যন্ত্রণায় তাড়িত হয়ে আর জীবনের বিভিন্ন বাস্তবতার দর্শনের নিরিখে এবং মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে কাফকা সৃষ্টি করেন তাঁর উল্লেখযোগ্য সেরাগল্প ‘অনশন শিল্পী’। গল্পটি ১৯২২-এ একটি জার্মান পত্রিকা এবং ১৯২৪-এ একটি গল্পের সংকলনে প্রকাশিত হয়।

১৯০৪-১৯১২’র মাঝে তিনি ১৮টি গল্প লিখেছিলেন। ১৯১২ সালের  ডিসেম্বর-এ বন্ধু ব্রড-এর উদ্যোগে সেই গল্পগুলো নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশিত হয় এবং বন্ধুকেই বই’টি উৎসর্গ করেন তিনি। ১৯১২ সালে লেখা হয় কাফকার সবচেয়ে বিস্ময়কর লেখা- ‘Die Verwandlung’ – ‘The Metamorphosis’ যা একটি মাসিক পত্রিকায় ১৯১৫ সালে প্রকাশিত। তবে গল্প/উপন্যাসিকাটি লিখে মোটেও সন্তুষ্ট ছিলেন না তিনি। তা আমরা জানতে পারি ২৩ নভেম্বরের তাঁর প্রেমিকা ফেলিস’কে লেখা একটি চিঠি’তে; যা শুরু হয় ঠিক এভাবে – ‘Cry, dearest cry, the time for crying has come! The hero of my story died a little while ago.’ সেই চিঠিতে তিনি জানিয়ে দেন,

‘I could have achieved a neater, more telling, better-constructed piece of work than the one that now exist.’

যে কারণে বন্ধু ম্যাক্স ব্রড’কে প্রায় তাঁর সব লেখাই পুড়িয়ে ফেলতে অনুরোধ করেছিলেন কাফকা। শুধু কয়েকটি ছাড়া, যার মধ্যে আছে ১৯১৯ সালের গল্প সংকলনে প্রকাশিত ‘গ্রামীণ ডাক্তার’ ও ‘অনশন শিল্পী’। শেষ পর্যন্ত যদিও কথা রাখেননি ব্রড। কাফকার অপরিসীম সাহিত্য ক্ষমতাকে চিনতে পেরে ১৯২৫-১৯৩৫-এর মধ্যে কাফকার অপ্রকাশিত গল্প ও উপন্যাসগুলো একে একে প্রকাশ করেন তিনি। খুব দ্রুত যা জার্মানি’তে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানকার বই পড়ুয়ারা খুঁজে পান কাফকার লেখা সর্বকাল সমাদৃত অমূল্য সাহিত্যসম্ভার। বিভিন্ন ভাষায় যা ক্রমেই বিস্তার লাভ করতে শুরু করে। এবং ইংরেজিতে অনূদিত হওয়ার পর তাঁর আজ এই কাফকা হয়ে ওঠা। কাফকা ছাড়া সবাই মোটামুটি বুঝে গিয়েছিলেন কাফকা সাধারণ কেউ নন। যেই আগুনের ফুল্কি তাঁর লেখায় খেলা করেছে সেটা থেকে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট তাঁর সৃষ্টিগুলো একদিন জগৎ বিখ্যাত হবে। এ কারণে তাঁর প্রেমিকা ফেলিস বাওয়ার মৃত্যুর আগে তাঁকে লেখা কাফকার তিনশোর বেশি চিঠি প্রকাশকের কাছে বিক্রি করে যান। এই প্রেমপত্র বিক্রি পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা! যার কারণে ফেলিসকে সবাই উপহাস করে বলে – “Kafka’s dearest businesswoman’। 

ফ্রান্‌ৎস কাফকার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন তার সাহিত্যকর্মের অভ্যন্তরীণ জগতকে আকার দিয়েছে। বিশেষত তার নিঃসঙ্গতা, দীর্ঘদিনের মানসিক অস্থিরতা এবং শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যে থেকেও তিনি গভীর জীবনদর্শনের জন্ম দিয়েছেন। নিজের কাজের প্রতি চূড়ান্ত নিষ্ঠা এবং সমাজের উপেক্ষার মধ্যে যে সংঘাত তিনি অনুভব করেছিলেন, তার প্রতিফলন আমরা পাই “অনশন শিল্পী”-তে। জীবনের অন্তিম সময়ে যক্ষার তীব্র যন্ত্রণা ও ক্ষুধার কষ্ট তাকে এমন এক অভিজ্ঞতা দিয়েছিল, যা এই গল্পে অনশন শিল্পীর আত্মত্যাগ ও সমাজের উদাসীনতার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে। “অনশন শিল্পী” যেন কাফকার ব্যক্তিগত যন্ত্রণার মূর্ত প্রতীক, যা তার সাহিত্যকর্মের গভীরতা ও বৈচিত্র্যকে বিশ্ব সাহিত্যের এক উচ্চতায় উন্নীত করেছে।

বলাবাহুল্য, “অনশন শিল্পী” (“A Hunger Artist”) তাঁর অনন্য দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং অস্তিত্ববাদী চিন্তার প্রতিফলন। ১৯২২/১৯২৪ সালে প্রকাশিত এই গল্পটি আধুনিক বিশ্ব-সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ রচনা হিসেবে বিবেচিত। গল্পটি একজন অনশন শিল্পীর জীবন, তার শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা এবং সমাজের সঙ্গে তার দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে আবর্তিত।

গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেন একজন অনশন শিল্পী, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে না খেয়ে থাকতে পারেন এবং এটিকেই তিনি শিল্পের এক বিশেষ রূপ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বিভিন্ন শহরে ভ্রমণ করেন এবং দর্শকদের সামনে একটি খাঁচায় বন্দি হয়ে অনশন প্রদর্শন করেন। প্রথমদিকে, তার এই বিশেষ দক্ষতা দর্শকদের আকৃষ্ট করলেও ধীরে ধীরে তার শিল্পের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যায়। আধুনিক সমাজে বিনোদনের নতুন মাধ্যমের আগমনে তার কাজ প্রাসঙ্গিকতা হারাতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত, শিল্পী একাকিত্ব এবং অনাদরের মধ্যে মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি স্বীকার করেন যে, তার অনশন ছিল নিছক ত্যাগ নয়, বরং তিনি কখনোই এমন খাবার খুঁজে পাননি যা তাকে সন্তুষ্ট করতে পারে।

“অনশন শিল্পী” গল্পটি কাফকার অস্তিত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গির একটি স্পষ্ট উদাহরণ। অনশন শিল্পীর জীবন এক অনন্ত অনুসন্ধানের প্রতীক। তিনি শুধু নিজেকে না, বরং সমাজকেও একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করান: জীবনের প্রকৃত অর্থ কী? শিল্পীর জন্য, তার অনশন কেবল শারীরিক ত্যাগ নয়, এটি তার সত্তার গভীরতম আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের একটি মাধ্যম।

গল্পে সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমদিকে, মানুষ অনশন শিল্পীর প্রতি উৎসাহী হলেও, ধীরে ধীরে তারা তার শিল্পকে মূল্যায়ন করা বন্ধ করে। এটি আধুনিক সমাজের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিনোদন চাহিদা এবং গভীর বিষয়ের প্রতি মানুষের উদাসীনতার প্রতীক। শিল্পীর প্রতি এই অবহেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শিল্প এবং তার মূল্যায়ন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে পরিবর্তিত হয়।

গল্পে খাঁচা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। এটি কেবল শিল্পীর শারীরিক অবস্থানের প্রতীক নয়, বরং তার মানসিক এবং আত্মিক বন্দিত্বেরও ইঙ্গিত দেয়। খাঁচাটি শিল্পীকে সমাজ থেকে আলাদা করে এবং তাকে তার নিজস্ব সত্তার মুখোমুখি দাঁড় করায়। এটি মানুষের অস্তিত্বের সংকট, পৃথকীকরণ এবং পরিচয়হীনতার প্রতীক হিসেবেও কাজ করে।

গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো শিল্পীর খাদ্যের প্রতি বিমুখতা। এটি কেবল শারীরিক অনাহার নয়, বরং জীবনের প্রতি তার অসন্তোষ এবং অস্বস্তির প্রকাশ। শিল্পীর এই মনোভাব মানুষের অতৃপ্তি এবং আদর্শ জীবনের অন্বেষণের প্রতীক।

ফ্রান্‌ৎস কাফকার “অনশন শিল্পী”-তে তার দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি গভীরভাবে অস্তিত্ববাদী ভাবনায় আবৃত। এটি জীবনের অর্থ, শিল্পের প্রকৃতি এবং মানব সত্তার গভীর সংকটকে কেন্দ্র করে রচিত। শিল্পী তার শিল্পের প্রতি এতটাই নিবেদিত যে, সমাজের স্বীকৃতি বা বাহ্যিক সাফল্যের চেয়ে স্বীয় অভ্যন্তরীণ তাগিদ এবং আত্মপরিপূর্ণতাকেই অধিক গুরুত্ব দেন। এই নিজস্বতার প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সমাজের অবহেলা গল্পটিকে শুধু মর্মস্পর্শীই করে না, বরং তা অস্তিত্ববাদী দর্শনের মূল প্রশ্নগুলোর প্রতিফলন ঘটায়।

অস্তিত্ববাদ অনুসারে, ব্যক্তি নিজেই তার অস্তিত্বের অর্থ সৃষ্টি করে এবং এর জন্য বাহ্যিক কোনো অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। গল্পের অনশন শিল্পীও তার জীবনকে এই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখেন। তিনি জানেন, তার শিল্প এমন কিছু যা সমাজ সহজে বুঝতে পারবে না। তবুও, তিনি তার কাজ চালিয়ে যান, যেন এটি তার অস্তিত্বের একমাত্র সত্য। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাকে সমাজের নিয়মকানুন, বিশেষ করে অনশনের নির্ধারিত ৪০ দিনের সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ করতে উদ্বুদ্ধ করে। তবে এই অবজ্ঞা এবং ভুল বোঝাবুঝি শিল্পীকে ক্রমাগত একাকিত্ব এবং বেদনাবোধে আবদ্ধ করে ফেলে, যা কাফকার রচনায় অস্তিত্ববাদী নিঃসঙ্গতার পরিচায়ক।

শিল্পীর জীবনের এই গভীর সংগ্রাম আসলে মানুষের স্বীয় সত্তার সন্ধান এবং জীবনের অর্থ খোঁজার চিরন্তন প্রচেষ্টার প্রতীক। কাফকার গল্পটি শিল্পীর আত্মত্যাগ এবং সমাজের উদাসীনতাকে এক সুত্রে গেঁথে অস্তিত্ববাদী সংকটের এক জটিল চিত্র তুলে ধরে। এটি পাঠককে মনে করিয়ে দেয়, জীবনের অর্থ বাহ্যিক স্বীকৃতিতে নয়, বরং নিজের সৃষ্টিশীলতা এবং অভ্যন্তরীণ তাগিদে নিহিত।

ফ্রান্‌ৎস কাফকার “অনশন শিল্পী” আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতা, শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা এবং জীবনের অর্থ খোঁজার চিরন্তন সংগ্রামের প্রতীক। এটি কেবল একটি গল্প নয়, বরং এক গভীর দার্শনিক পাঠ, যা শিল্পীসত্তার আত্মত্যাগ ও মানসিক সংকল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। আধুনিক সমাজে যেখানে বিনোদনের মাধ্যম দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং মানুষের আগ্রহ ক্ষণস্থায়ী হয়ে পড়ছে, সেখানে এই গল্প আমাদের শিল্প, ত্যাগ এবং মানব জীবনের প্রকৃত অর্থ নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। কাফকার এই রচনা শুধু শিল্পের অন্তর্নিহিত সংগ্রাম নয়, বরং মানব জীবনের গভীর সংকট ও সম্ভাবনাকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরে।

এই আখ্যানে অনশন শিল্পীর বুভুক্ষ দেহ কেবলমাত্র শারীরিক ক্ষুধার প্রতীক নয়; বরং এটি তার মানসিক শক্তি এবং কাজের প্রতি চূড়ান্ত নিষ্ঠার প্রতিফলন। শিল্পী তার শরীরকে এমনভাবে প্রস্তুত করেছে যে উপবাস তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। যদিও কর্তৃপক্ষ দর্শকের আগ্রহ এবং সীমাবদ্ধতাকে মাথায় রেখে তার জন্য নির্দিষ্ট ৪০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে, তবু শিল্পীর আকাঙ্ক্ষা এর চেয়েও গভীর। তিনি চান মানুষ তার আত্মত্যাগের প্রকৃত অর্থ বুঝুক এবং তার মানসিক দৃঢ়তা ও ইচ্ছাশক্তিকে স্বীকৃতি দিক। অনশন শিল্পীর চূড়ান্ত ইচ্ছা একটাই—তার কাজ এবং আত্মত্যাগ যেন মানুষের কাছে কেবল কৌতূহল নয়, বরং অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। এই দুইয়ের সমন্বয়েই গল্পটি শিল্পীসত্তার গভীর সংগ্রাম এবং শিল্প-উপভোগকারীর মানসিক জটিলতাকে অসামান্যভাবে তুলে ধরে।

 ফ্রানৎস কাফকার ‘A hunger Artist’ গল্পের মূল চরিত্র নিজেকে এক অনন্য শিল্পীরূপে প্রতিষ্ঠা করেছেন, যিনি তার কাজকে মনে করেন চূড়ান্ত দক্ষতায় পূর্ণ এবং মহান শিল্পের নিদর্শন। তবে, তার এই সৃজনশীলতার প্রকৃত মূল্যায়ন কখনোই হয়নি। তাকে ৪০ দিনের অনশন সীমায় বেঁধে ফেলা হয়, যদিও তিনি বিশ্বাস করেন যে এই সীমা ছাড়িয়ে যাওয়াও তার পক্ষে সহজ। শিল্পীর ধারণা, মানুষের মধ্যে এক ধরনের অসীম আধ্যাত্মিক ক্ষমতা রয়েছে, যা অধিকাংশ মানুষ উপলব্ধি করতে পারে না। ফলে তার এই অদ্ভুত শিল্পের গভীরতাকে কেউ বুঝতেও পারে না। এই অক্ষমতা ও সন্দেহভাজন মনোভাব তাকে সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়ায় এবং একটি গভীর বেদনাবোধ তৈরি করে।

গল্পে কাফকা জাগতিক চাহিদার বাইরে থাকা সুপ্ত বাসনা ও আধ্যাত্মিক শক্তির একটি স্তরকে প্রকাশ করেছেন, যা সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। শিল্পীর জীবন এবং তার কাজের প্রতি দর্শকদের উদাসীনতা আসলে মানুষের নির্মম বাস্তবতা ও অমানবিকতারই প্রতিফলন। যখন মানুষ তার কাজের প্রতি সম্পূর্ণ আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং তাকে ভুলে যায়, তখনই তার জীবনের মর্মান্তিক পরিসমাপ্তি ঘটে। এই শিল্পীর দুঃখবোধ শুধু তার ব্যক্তিগত যন্ত্রণা নয়, এটি আধুনিক সমাজের সেই মানসিক দিককে তুলে ধরে যা ব্যক্তিকে তার সৃজনশীলতা এবং অস্তিত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

“অনশন শিল্পী” গল্পটি শিল্পী, শিল্পসত্তা এবং দর্শকের সম্পর্ককে মনস্তাত্ত্বিক গভীরতায় বিশ্লেষণ করেছে। জীবনের নিরানন্দ, অবমূল্যায়ন, নির্মম বাস্তবতা এবং আশা-নিরাশার টানাপোড়েন গল্পটির মূল উপজীব্য। আধুনিক সমাজে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা এবং অর্থহীনতার অনুভূতি, যা কাফকার রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য, এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ কারণেই ‘A Hunger Artist – বা অনশন শিল্পী’ বিশ্বসাহিত্যে একটি চিরস্মরণীয় রচনা হিসেবে বিবেচিত হয়। গল্পটি শুধু শিল্পের গভীরতা নয়, বরং মানুষের অস্তিত্বের এক গভীর প্রশ্নও তুলে ধরে, যা পাঠককে নিজের জীবন ও সমাজ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

  • শালুক কাফকা সংখ্যা – রূপান্তরিত পাঠশালায় অনিবার্য কাফকা’তে প্রকাশিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *