তাহাজ্জুদের সময় সাদাত সাহেব একা বসে কাঁদেন। এ জীবনে তিনি বহু কিছু করেছেন। তবুও তার মনে হয় কিছুই গুছিয়ে শেষ করতে পারলেন না। তিনি হঠাৎ চলে গেলে মেয়েটা সম্পত্তির কিছুই পাবে না। বেশিরভাগ ছেলের নামে। অথচ এই ছেলে তার কোনো খোঁজ রাখে না। তার পৃথিবী শুধুই তার বউ-বাচ্চা নিয়ে। সেখানে পিতা-মাতার কোনো স্থান নেই। একটা স্বার্থপর ছেলে!
সাদাত সাহেব কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে সাহায্য চান, ‘ইয়া মাবুদ, একটু সুযোগ দাও। মেয়েটাকে যেন তার জমির ন্যায্য অংশ বুঝিয়ে দিতে পারি।’
বেশকিছু জমি দান করবেন বলেও তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মরার আগে পাপের বোঝা কমাতে না পারলে আল্লাহর কাছে গিয়ে কী জবাব দিবেন?
মুক্তিযুদ্ধের সময় কিছুটা সাহস, কিছুটা বুদ্ধি খাটিয়ে আজ এতকিছু। কম কষ্ট করেননি। প্রাণ ভয়ে যখন সবাই পালাতো, মালামাল কাঁধে নিয়ে তিনি পথে পথে ঘুরেছেন। যা কিছু পেয়েছেন, জড়ো করে সম্পদের পাহাড়
গড়েছেন।
বাসা থেকে তিনি মিলিটারিদের নিয়মিত খাবার পাঠাতেন। আবার সুযোগ পেলেই গোপনে মুক্তি বাহিনীকেও যথাসাধ্য সাহায্য করতেন।
যুদ্ধের সময় হঠাৎ একদিন মিলিটারি ক্যাম্পে সাদাত সাহেবকে ডেকে পাঠানো হলো। চিন্তিত মুখে তিনি অপেক্ষা করছেন আর দোয়া দুরুদ পড়ছেন। কী ঝামেলা হয়েছে ঠিক বুঝতে পারছেন না।
বড়ো সাহেব ঘুম থেকে উঠে তাকে ভেতরে ডাকলেন। ইংরেজি ভাষায় বেশকিছু কথা বললেন যেগুলোর কিছুই তিনি বুঝতে পারলেন না। তবে মুখের হাসি দেখে মনে হলো হয়তো খারাপ কিছু হবে না। দোভাষী মকবুল রাজাকার জানালেন, সাদাত সাহেব আপনার পাঠানো খাবার স্যারের খুব পছন্দ হয়েছে। তিনি বলেছেন যে-কোনো সময় আপনি তার কাছে আসতে পারবেন। কারণ খাওয়া নিয়ে বেশ কিছুদিন তিনি অস্বস্থিকর পরিস্থিতির মধ্যে আছেন। আপনি সেই সমস্যার সমাধান করে ফেলেছেন। তাই উপহারস্বরূপ তিনি আপনাকে একটি বিশেষ পাস দিয়েছেন। মিলিটারির যে কাউকে এটা দেখালে আপনার সাত খুন মাফ।
কথাটা শোনামাত্র ক্যাম্পে ঢোকার সময়ের একটি করুণ মুহূর্তের কথা তার মনে হলো। একটা মেয়ের আর্তনাদ কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। হয়তো আজ রাতে বিশেষ চাহিদা, সেবা শুশ্রƒষার জন্যে মেয়েটিকে এখানে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে। পূর্ণিমার চাঁদের মতো চেহারা। ঠিক অবিকল যেন তার মায়ের প্রতিচ্ছবি। দেখামাত্রই মায়ের কথা মনে পড়ায় বুকের মধ্যে মোচর দিয়ে উঠেছিল।
তৎক্ষণাৎ তিনি একটা সিদ্ধান্ত নিলেন। সদ্য হাতে পাওয়া উপহারের ক্ষমতা তিনি এখনই পরীক্ষা করবেন।
ধরে নিয়ে আসা মেয়েদের সাধারণত যেখানে আটকে রাখা হয়, সেই রুমের দিকে তিনি এগিয়ে গেলেন। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পাহারারত অফিসারকে গিয়ে হাতের কাগজটা দেখালেন।
অফিসার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বিনীতভাবে জানতে চাইলেন, কীভাবে সহায়তা করতে পারি? খুব সচরাচর যেটা ঘটে না! তাজ্জব ব্যাপার!
সাদাত সাহেব তাকে বললেন, একটু ভেতরে যেতে চাই। আমার নিকট আত্মীয় একজনকে ভুলক্রমে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে বলে ধারণা করছি।
সেখানে গিয়ে তিনি সত্যি অবাক হলেন! যা দেখলেন সেটা কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ মেনে নিতে পারবে না। অনেক পরিশ্রান্ত মুখ! সবার চোখেমুখে রাতজাগার সুস্পষ্ট ছাপ। আমানবিক শারীরিক নির্যাতনে তারা হয়তো দীর্ঘদিন ঘুমাতে পারে না। ক্ষুধা, যন্ত্রণা, লজ্জা অপমান সত্ত্বেও তারা কেমন করে বেঁচে আছে এটাই আশ্চর্যের বিষয়!
চরম দুঃখী সম্ভ্রমহারা নারীদের চোখের দিকে তিনি তাকাতে সাহস পেলেন না। নিজেকে কেমন যেন অপরাধী মনে হচ্ছে। এই অবর্ণনীয় অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে তিনি অপারগ। বার বার মনে হয় খাবারে বিষ মাখিয়ে দেই।
কিন্তু করতে পারেন না। তার সেই মনের জোর নেই।
সাবধানে খেয়াল করতেই দেখলেন, কোনার দিকে আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় সেই মেয়েটি তার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
হাত ইশারায় অফিসারকে লক্ষ করে তিনি ইঙ্গিত করলেন। আর মেয়েটির কাছে এগিয়ে গেলেন, মারে চিন্তা করিস না। এই নরক থেকে তোকে নিয়ে যাব। আমার সাথে শুধু একটু অভিনয় কর। মাথায় হাত দিয়ে পরম স্নেহে সাথে সাথেই তাকে জড়িয়ে ধরলেন।
মেয়েটি কিছু বুঝে ওঠার আগেই কর্তব্যরত অফিসারের সম্মতিক্রমে তাকে মুক্ত করে বেরিয়ে পড়লেন।
বন্দি পাখি ছাড়া পেলে বেশ কিছুক্ষণ যেমন উড়তে ভুলে যায়। মেয়েটিও তেমন ঘটনার আকস্মিকতায় নিজের ভাগ্যকে যেন ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিল না। কিছুটা শান্ত হবার পর সাদাত সাহেব নিজে তাকে একটি আশ্রয় কেন্দ্রে পৌঁছে দিয়ে আসলেন।
ফেরার সময় মেয়েটি তাকে অবাক করে দিয়ে বলেছিল, সাবধানে থেকো বাবা। স্বাধীন দেশে নিশ্চয় একদিন দেখা হবে! অন্য কোনো জন্মে বিশ্বাসী হলে ঠিক বলতাম, পরের জন্মে যেন সত্যি সত্যি তোমার মেয়ে হয়ে জন্মাই।
সে সময় সাদাত সাহেবের বুকটা দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল সাথে নিয়ে যাই। কিন্তু উপায় নেই, এই দেশে এখন কার নিরাপত্তা কে দেবে? তার কোনো ঠিকঠিকানা নাই।
আজ থেকে তুই আমার মেয়ে, কথা দিচ্ছি দেশ স্বাধীন হলে যদি বেঁচে থাকি, তোকে আমার কাছে নিয়ে রাখবো।
সেদিন সাদাত সাহেবের যতটুকু করণীয় তিনি তা করেছেন। আর সান্ত্বনা হিসেবে নিজেকে বুঝিয়েছেন, যেই পক্ষই জিতুক, তার কিছু যায় আসে না। ভালো-মন্দ বিচারের দায়িত্ব তার না। দেশ নিয়ে এত মাথা ঘামানোর সময় নেই। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিজ পরিবারকে আগলে রাখাই একমাত্র কাজ।
সেইসব দিনের কথা মনে হলে আজ কেমন যেন গা শিউরে ওঠে।
কিছুদিন আগে স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তী উৎসব হয়ে গেল। অথচ যুদ্ধ শেষে অসংখ্য জায়গায় খোঁজ করেও হারিয়ে যাওয়া সেই মেয়েটিকে তিনি খুঁজে পাননি। সে বেঁচে আছে কি না এখনো তার জানা নেই।
মাঝে মাঝেই ভাবেন আশ্রিতদের জন্যে কতটুটুই-বা আমরা আসলে করতে পেরেছি!
পুরাতন স্মৃতি ভাবতে ভাবতেই প্রায়ই ভোর হয়ে যায়। নিজের মেয়েটা সারাক্ষণ তার চিন্তায় অস্থির থাকে। প্রতিদিন অসংখ্যবার ফোন করে। রাজ্যের প্রশ্ন।
—কী খেয়েছ? ঘুম কেমন হয়েছে আব্বু? আম্মু বলল, প্রতিরাতে উঠে বসে থাকো? তোমাকে তো ভালো কোনো ডাক্তার দেখাতে হবে। আমি তোমাকে নিতে আসবো?
তিনি কিছুতেই রাজি হন না। তার সময় শেষ হয়ে এসেছে, অযথা খরচ করেই-বা কি লাভ।
এভাবেই খুনসুটিতে কেটে যাচ্ছে সময়।
কথার পিঠে কথা হয় দুজনের! মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। এতুটুকু শান্তির জন্যে তো আসলে মানুষ বেঁচে থাকে। সন্তানের কাছে বাবা-মায়ের চাওয়া এই এতটুকুই।
মেয়েটার জন্যে ইদানীং খুব অস্থির লাগে। অকারণে চোখ ভিজে উঠে। জামাই সচ্ছল। ভালো ছেলে, বেশ বুদ্ধিমান। বউয়ের শখ-আহ্লাদ, রাগ-অভিমান হাসিমুখে সহ্য করা এমন ছেলে পাওয়া মুশকিল। তবুও তাদের ভবিষ্যতের জন্যে সবকিছু ঠিক করে যেতে পারলেই শান্তি।
দুদিন ধরে পেটের সমস্যা শুরু হয়েছে। শরীরে মোটেই শক্তি পাচ্ছেন না। এই মুহূর্তে কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে। তাকে হাসাপাতালে নেওয়া হচ্ছে। অক্সিজেন মাক্স লাগানো অবস্থায় মেয়েটির দিকে তিনি নির্বাক তাকিয়ে আছেন। হাত ইশারায় যেন কিছু একটা বলতে চাইলেন। পারলেন না!
মনে মনে বললেন, সময় পেলাম নারে মা, ক্ষমা করে দিস তোর বাবাকে।
বাবার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটা নিয়ে মেয়েটি বসে আছে। শূন্যদৃষ্টিতে আকাশের পানে তাকিয়ে ভাবছে, আর কোনোদিন আব্বু ফোন করবে না। বাবার শেষ স্পর্শ আর হাতে থাকা মোবাইল ফোন, তার কাছে শেষ উপহার
হয়ে রইল।
Leave a Reply