বিকেলের এ সময়ে পরশ পুকুর পাড়ের খোলা চালায় বসে মাছের খাবার দেয়। অবাক বিষয় হলো ঠিক পরশের আশার সময় অগণিত মাছের ছোটাছুটি শুরু হয়। আজকেও মাছেরা হাজির। কিন্তু খাবার দেবার সেই লোকটি নেই। মাছগুলো আসলে জানে না, পরশ আর আসবে না। কেন আসবে না, ঘটনাটা একটু বলি।
গতকাল বিকেলে পরশ গেছে তার একমাত্র বড়ো ভাই শুভ্রর বিয়ের পাত্রী দেখতে। সঙ্গে দুলাভাই শওকত হোসেন। তিনি একজন ব্যবসায়ী। তাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এটা পরশ কোনোমতেই মেনে নিতে পারছে না। কিন্তু পরশ জানে না টাকা ও ক্ষমতার কাছে মোটামুটি এই জগৎ জিম্মি। সেখানে পরশের বাবা মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষক আর কিইবা করতে পারে? তাই তিনি মেয়ের কথামতো সমস্ত দায়ভার শওকত সাহেবের উপর চাপিয়ে দিয়ে নফল নামাজ পড়তে বসেছেন।
এদিকে পিতাভক্ত দুই সন্তান বিরসবদনে দুলাভাইয়ের গাড়িতে বসে আছে। পরশের ভাই শুভ্র সদ্য বিসিএস ক্যাডার। মায়ের খুব ইচ্ছে বিয়ে করে বউ সঙ্গে নিয়েই নতুন জীবন শুরু করুক। সে বড়ো হয়েছে বড়ো বোনের টাকায়। শওকত সাহেবের সে মোটামুটি বাধ্যগত। চাকরি পাওয়ার দুই দিন পরেই একজন লোক এসে হাজির। তিনি একজন ডানাকাটা পরির খোঁজ নিয়ে এসেছেন। দুই গ্রাম পরের চেয়ারম্যান সাহেবের মেয়ে। সবেমাত্র জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স পাস করেছে। চেয়ারম্যানের অনেক ইচ্ছা সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁস শুভ্রর সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিবেন। তাই তিনি মেয়েকে না জানিয়েই মোটামুটি এই ব্যবস্থা করে ফেলেছেন।
পরশ ও শুভ্র পিঠাপিঠি দুই ভাই। শুভ্র ছোটোবেলা থেকেই পড়াশোনায় অত্যন্ত মনোযোগী, প্রতি ক্লাসে প্রথম। দেখতে শ্যামবরণ, মানুষ হিসেবে রোবট টাইপ। পড়াশোনা হলো তার জীবন। ছেলেবেলা থেকে কারো সঙ্গে কেউ
কখনো তাকে দেখেনি। অন্যদিকে পরশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুন্দর করে কথা বলতে পারে। যে-কোনো মানুষের সঙ্গে সহজে মিশতে পারে। গল্প ও কবিতার বই প্রতিরাতে পাশে নিয়েই ঘুমুতে যায়। তার মায়ের মতো দুধে আলতা রং। দেখতে বাংলা সিনেমার নায়ক বলা যায়। আবৃত্তি এবং উপস্থিত বক্তৃতায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত মুখ। সে এবার সরকার ও রাজনীতিতে মাস্টার্স শেষ করে বাসায় এসে বসে আছে। চাকরি করবে না, সে হবে উদ্যোক্তা। কিন্তু কী সেটা, নিশ্চিতভাবে এখনো বলতে পারছে না।
পরশদের শরবত, রসগোল্লা, আপেল, কলা ও পেয়ারা দেওয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান সাহেব পান চিবুচ্ছেন। কালো দাঁতের হাসি কি মায়ামাখা! তিনি শওকত সাহেবকে শরবত নিতে অনুরোধ করছেন এবং বলছেন, মেয়েটাকে অনেক আদর দিয়ে মানুষ করছি। আমার যা কিছু সবই তার। বাড়ির পাশে বলে আমার আগ্রহটা বেশি। বিদেশের অনেক ছেলের খবর আসছে, রাজি হই নাই। টাকাপয়সা তো আল্লাহতায়ালা কম দেয় নাই। লোকজন কইবো জামাই ম্যাজিস্ট্রেট সরকারি চাকরিজীবী, এটাই বড়ো কথা।
শওকত সাহেব হাসতে হাসতে শরবত নিলেন এবং বললেন, শুভ্র সরকারি চাকরি পাইছে তবে জীবনের অঙ্কটা বেশ ভালোই বোঝে। এই যেমন আসতে আসতে বলল, দুলাভাই কিছু টাকা হলে আপনার ব্যবসায় যুক্ত হব। আরে বেটা তুই হইলি দরিদ্র ঘরের সন্তান। তোর স্বপ্ন থাকবে ভালো কথা কিন্তু টাকা জোগাড় করবি কীভাবে? তুই টাকা কই পাবি? দেখেন তো ব্যাপারটা, আমি তো ভাই ওর কথা শুনে অবাক!
চেয়ারম্যান সাহেব কথা লুফে নিয়ে বলল, কত টাকা মিয়াভাই?
শওকত সাহেব চশমার ফ্রেমে মুখের ভাপ দিলেন, তারপর জামার কোনায় ঘষতে ঘষতে বললেন, নতুন একটা মার্কেট করব দুই কোটি তো লাগবেই। কোটিখানেক জোগাড় করা আছে। বাকিটা হলেই কাজ শুরু করব। আর জমি যেহেতু আমারই কেনা, সেহেতু টাকাটা যে দিবে সেই ২৫% এর মালিক।
পরশ শওকত সাহেবের দিকে অবাক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে, তার বিশ্বাস হচ্ছে না, এই লোক কী বলছে!
চেয়ারম্যান সাহেব আরেকটা পান মুখে দিয়ে চিবুতে শুরু করলেন। মুখে হালকা হাসি রেখে বললেন, মেয়েটারে দেখেন তারপর কথা হবে। আগেই বলছি আমার সবকিছু তার।
পরশ বাইরে বের হয়ে এলো। বসে থেকে এসব কথা হজম করা তার পক্ষে সম্ভব না। বাইরে একটা ছোট্ট শিশু দাঁড়ানো। অদ্ভুত মায়াবী চোখ। দেখতে অবিকল চেয়ারম্যান সাহেবের মতো। কিন্তু সে তো শুনেছে মেয়েই সবকিছু। সে ইশারায় ডাকল। কোনো কাজ হলো না। সে পকেটে রাখা ললিপপ বের করলো। ভেবেছিল হবু ভাবিকে দিয়ে ভরকে দিবে কিন্তু সেই ইচ্ছা যেন মরে গেছে। শিশুর মুখে হাসি। এগিয়ে আসতেই খপ করে ধরে ফেলে বলল—এই নাও, কী নাম তোমার? উত্তর না দিয়েই মায়াভরা হাসি দিল। পরশ জিগ্যেস করল, এই বাসায় পুকুর আছে? শিশুটি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
—চলো যাই।
পুষ্পিতা মন খারাপ করে পুকুর পাড়ে বসে আছে। দুবার মা এসে বলে গেছে, বাসায় মেহমান আসছে। তার জন্যে নতুন শাড়ি কেনা হয়েছে, পরে আয় আমি তোকে আজকে সাজিয়ে দিব। সে মহাবিরক্ত। তাকে সাজিয়ে দেবার কী আছে! বাচ্চা নাকি! পুকুর পাড়ে পানিতে পা ডুবিয়ে বসে আছে। এলো চুলগুলো বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ওড়না কোমরে বাঁধা। পাড় বাঁধানো পুকুরের সিঁড়ির মধ্যে হাতে ভর দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। এত সুন্দর নীল আকাশ অনেকদিন দেখা হয়নি। মেঘের ভেলা ভেসে চলেছে প্রতিনিয়ত।
পরশ পুকুর পাড়ে এসে দেখে কেউ একজন দুই হাতে ভর দিয়ে সিঁড়িতে বসে আছে। অবাক বিষয় হলো মেয়েটির পা পানিতে ডুবানো এবং সে তাকিয়ে আছে খোলা আকাশের দিকে। চুলগুলো উড়ছে হাওয়ায়। মনে হচ্ছে, এক
দৌড়ে চুলগুলো ছুঁয়ে দেই। এবার সে লক্ষ করল উপর থেকে মেয়েটির খোলা বুকের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। পুকুরে পদ্ম ফুটেছে বলেই তার যেন মনে হলো। সে কি ফিরে যাবে? নাকি কাছে গিয়ে বসবে?
পাশে পড়ে থাকা একটি ছোটো ঢিল ছুড়ে দিল পুকুরের মাঝ বরাবর। একেই বলে দৃষ্টি আকর্ষণ। সে মেয়েটির মুখ দেখতে চায়। মুহূর্তে দৃষ্টি বিনিময় হলো! মেয়েকে কি সে আগে দেখেছিল? এত পরিচিত মনে হচ্ছে কেন? তার
চেয়ে বড়ো কথা মেয়েটির চোখ দুটো অসম্ভব সুন্দর! রূপবতী কন্যাদের খুব সম্ভবত পরিচিতই মনে হয় সবসময়ই। তবে তার কিছু আসে যায় না। এই মুহূর্তে এগিয়ে যাওয়াই হলো নিয়তি।
পরশকে দেখে পুষ্পিতা ধরে নিয়েছে এই লোককে হয়তো তার মা পাঠিয়েছে। সে কী করবে ঠিক বুঝতে পারছে না। কিন্তু অবাক বিষয় হলো এই লোক তার পাশে বসে পুকুরে ঘুরতে থাকা রাজহাঁস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। জীবনে এই প্রথম রাজহাঁস দেখল কি না কে জানে? মানুষটির ভেতর একধরনের সরলতা যেন সে অনুভব করল। কিছুক্ষণ পর পর শব্দ করে হাসছে আর হাতে পানি নিয়ে হাঁসগুলোর দিকে ছুড়ে মারছে। এটা কী ধরনের খেলা। সে বুঝতে পারছে না, কিছু পানি তার নিজের শরীরেও যেন এসে পড়ছে। এই লোক এসেই ঢিল ছুড়ছে, তারপর এসে পাশে বসে বলছে, সে তার সঙ্গে কথা বলতে আসেনি, বলেই হাঁস নিয়ে ব্যস্ত। সে আসলে বোঝার চেষ্টা করছে, এটা কি অভিনয়? তাকে খুশি করার কোনো কৌশল।
পরশের হঠাৎ মনে হলো সে অনেক বড়ো অন্যায় করে ফেলেছে। পাশে এত রূপবতী কন্যা রেখে সে এখন মেতে উঠেছে নতুন খেলায়। তাই মাথা ঘুরিয়ে বলল, আমি খুব দুঃখিত। সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে কেউ হয়তো এইরকম
আচরণ করে না। সবাই আপনাদের গুরুত্ব দিবে। এটাই হয়তো নিয়ম, তবে আমার মনটা ভীষণ খারাপ। তাই নিয়মবিরুদ্ধ আচরণ করে ফেলছি। সত্যি বলতে কি আমার মন বিক্ষিপ্ত হলে সাধারণত উলটাপালটা কাজ করা শুরু করি। আর তখন মন খারাপের বিষয়টা মাথায় থাকে না। ধীরে ধীরে আমি খুব ভালো বোধ করতে শুরু করি।
ভালো কথা, চেয়ারম্যান সাহেব আপনার কী হন?
পুষ্পিতার পালটা প্রশ্ন—তার কাছে আপনি কেন এসেছেন?
পরশ জবাব দিল—ব্যাবসায়িক কাজে এসেছিলাম। সেই বিষয়ে ভেতরে এখনো বিস্তারিত আলোচনা চলছে।
পুষ্পিতার মনে হলো এই লোক তার সঙ্গে রসিকতা করছে।
পরশ বলল—আপনি?
পুষ্পিতা উত্তর দিল—আমি সেই পণ্য।
দুজন দুজনের দিকে কিছুক্ষণ যেন তাকিয়ে থাকল…
Leave a Reply