অনুগল্প, গল্প

অণুগল্প – নীল কষ্ট

আমি মাঝে মধ্যেই একটা স্বপ্ন দেখি। কালো বোরখা পড়া হরিণ চোখের মেয়ে আমার পাশে বসে আছে। তার হলুদ মাখা হাতের আঙুল আমার হাতে খেলা করছে। সোনালি ফ্রেমের চশমা ভেদ করে চোখ চলে যায় দু-চোখের তারায়। আমি চাই তার চুলগুলো উড়ে এসে আমার মুখ স্পর্শ করুক। সেই আবেশে আমি হারিয়ে যাব তার হৃদয়ের গহীনে। কিন্তু চুল’তো বোরকার আবরণে ঢাকা। ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে আমি বসে থাকি।

রিকশা চলতে থাকে প‍্যারিস রোডের অন্তহীন পথে… যে পথের শেষ কোথায় আসলে কেউ জানি না!

স্বপ্নটা আজ আবার দেখলাম। জানালার পাশে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকলাম।

সবুজ পাতাগুলোতে রাতভর বৃষ্টির ছাপ। ঝড়ো বাতাসে মাটিতে ঝরে পড়েছে বেলিফুল। তার সুবাস আমার ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে।

হঠাৎ কি মনে হলো, ঠিক করলাম রাজশাহী যেতে হবে। খুব দ্রুত এয়ারপোর্টে ছুটলাম।

প্রায় দুই যুগ পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প‍্যারিস রোডে দাঁড়িয়ে আছি। গাড়ি আর রিকশাগুলো একে-একে আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। সেদিকে খেয়াল নেই আমার। মনে হলো যেন কিছু একটা খুঁজছি। শুনেছি আশে-পাশের কোনো এক শিক্ষক কোয়ার্টারে থাকে সে।

বুকটা দুরু দুরু কাঁপছে। আমি আমার হৃদকম্প স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। সামনে তাকাতেই দৃষ্টি আটকে গেল।

বহু বছর আগের সেই রিকশাটা হঠাৎ আবার দেখলাম আমি। ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। রিকশায় বসে আছে সে, নিস্পলক তাকিয়ে আছে। তাঁর চোখের পাতা একটুও নড়ছে না। পাশ কাটিয়ে যাবার সময় শুধু দেখলাম, পাশে বসা সম্পূর্ণ অপরিচিত অন‍্য মানুষ, যাঁর কোলে ফুটফুটে কন্যা শিশু খিলখিল করে অবিরত হাসছে। ঝরনার মতো সেই শব্দটাই কেবল নির্বাক হয়ে শুনছি।

সময় যেন স্থির হয়ে গেছে, কিছুতেই আর পেছনে তাকাতে পারলাম না। মনে হলো বুকভরা অভিমান সেই কবে থেকে পুষে রেখেছি। চুপচাপ একা-একাই আরও বেশ কিছুক্ষণ হাঁটলাম। বড়ো বড়ো গাছগুলোর ফাঁকে গোধূলির আলো এসে পড়েছে। একটু পরেই অন্ধকার ঘনিয়ে আসবে।

জানি তার ফেরার পথ নেই, আর আমার যাবার কোনো জায়গা নেই। ঘরছাড়া বিবাগি এক মানুষ আমি, যার বুকে লুকানো কেবল নীল কষ্ট।

অণুগল্প’টি কলকাতার অভিজান পাবলিশার্স ও বাংলাদেশের ভাষাচিত্র’র – প্রেমের অণুগল্প ও কবিতা সংকলনে প্রকাশিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *